ভূমিকাঃ
আমার বই সংগ্রহের অন্যতম উৎস হচ্ছে বইমেলা। ‘ময়নাদ্বীপ’ বইটি আমার সংগ্রহ একুশে বইমেলা ২০২৫ থেকে। এই বইমেলাইয় সর্বপ্রথম কেনা বই এটি। পরিচিত নাম দেখে হাতে নিয়ে দেখি এটি ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর রচিত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে লেখা। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসটি শেষ হয় কুবের ও কপিলার ময়নাদ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রার মাধ্যমে। কিন্তু যাত্রার পরে কি হয় তা আর পাঠকের জানা হয় না। এই অপূর্ণতার উপর ভিত্তি করে লেখক মহি মহিউদ্দিন লিখেছেন ‘ময়নাদ্বীপ’ বইটি। আমার নিজেরও এই ব্যাপারে কৌতূহল ছিল। তাই এই বইটি সংগ্রহ করি।
লেখক পরিচিতিঃ
মহি মুহাম্মদ ফটিকছড়ির আছিয়া চা-বাগানে ১৯৭৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। চা-বাগানের আলো-বাতাসেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। তরুণবেলা থেকেই লেখালেখি। সমাজের প্রান্তজনরা তার গল্পের চরিত্র। তার গল্পগ্রন্থ অহল্যাকথা, সুচেতনা ও হরিশ্চন্দ্রলাইন ও কয়েকজন শেফালির গল্প। তিনি উপন্যাসও লিখেছেন—আড়াইপাতা, চা-বাগান শ্রমিকদের জীবন নিয়ে। ঘাম-কাম, ক্রোধ-উদারতা, প্রতিশোধ-প্রতিরোধ নিয়ে চা শ্রমিকের জীবনচিত্র আঁকার চেষ্টা আড়াই পাতায়। (তথ্যসুত্রঃ বইয়ের কভার)
কাহিনীসংক্ষেপঃ
বইয়ের শেষে যদিও কাহিনী সংক্ষেপ দেয়া আছে কিন্তু আমার তা খুব একটা ভালো লাগেনি। তাই নিজের মত করে কাহিনী সংক্ষেপ লিখলাম।
উপন্যাস শুরু হয় পদ্মা নদীর মাঝির শেষ থেকে। ময়নাদ্বীপে যাত্রার সংক্ষিপ বর্ননা দিয়ে গল্প শুরু হয়। কুবের-কপিলা আরো কয়েকজন সহ ময়নাদ্বীপে পৌছায়। হোসেন মিয়া কুবের কপিলার বসবাসের ব্যবস্থা করে ব্যবসায়ের উদ্দ্যেশ্যে আবার ময়নাদ্বীপ ছেড়ে যায়। কুবের ধীরে ধীরে ময়নাদ্বীপে জমি বের করার কাজ শুরু করে। হোসেন মিয়ার অবর্তমানে দ্বীপের মুলত কর্নধার শ্যামল। ক্রমেই শ্যামলের সাথে কুবেরের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। কপিলাও একসময় শ্যামলের দিকে ঝুকে পড়লে কুবের কপিলারও দূরত্ব সৃষ্টি হয়। কুবের বিভিন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে ময়নাদ্বীপে শ্যামলের বিকল্প হয়ে উঠে এবং ময়নাদ্বীপের নেতা হয়ে উঠে।
পর্যালোচনাঃ
ময়নাদ্বীপ উপন্যাসটি যদিও লেখক পাঠকের অতৃপ্তির উপর ভিত্তি করে লিখেছেন কিন্তু আমার মনে হয় উপন্যাসটি তার উদ্দ্যেশ্য পূরনে ব্যার্থ হয়েছে। ময়নাদ্বীপ বইটিতে লেখক গল্পের প্রয়োজনে পদ্মা নদীর মাঝির বেশ কয়েকজন চরিত্রকে নিয়ে এসেছেন কিন্তু সবগুলো চরিত্রই নিষ্প্রাণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিষ্প্রাণ হচ্ছে হোসেন মিয়া। ময়নাদ্বীপ যার রাজ্য, সেই হোসেন মিয়ারই তেমন কোন উপস্থিতি নেই গল্পে। অথচ হোসেন মিয়া চরিত্রের গুরুত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। পদ্মা নদীর মাঝিতে হোসেন মিয়া সম্পর্কে অনেক তথ্য অনুপস্থিত যা লেখক ময়নাদ্বীপে সংযোগ করতে পারতেন।
যে কপিলা নিজের স্বামী-পরিবার ছেড়ে কুবেরের সাথে ময়নাদ্বীপ রওনা করে সেই কপিলাই খুব অল্প সময়ের মধ্যে কুবের কে ভুলে ক্ষমতাধর অন্য পুরুষে আসক্ত হবে এটা খুব একটা মানা যায় না। এইখানে গল্পের আরো রসদ প্রয়োজন ছিল।
ময়নাদ্বীপের এত মানুষজনের মধ্যে কুবের ছাড়া আর কেউ গাছে উঠতে পারে না বা মাছ ধরতে পারে না এটা প্রায় অবান্তর। যেখানে সবাই গ্রামে সংগ্রামী জীবন যাপন করেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে ময়নাদ্বীপে বসবাস করেছে সেখানে প্রায় সবাই গাছে উঠতে পারা বা মাছ ধরাতে পারার কথা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কবের চরিত্রকে যেভাবে অঙ্কন করেছেন মহি মহিউদ্দিন ময়নাদ্বীপে সেভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি। তবে ভালই চেষ্টা করেছেন। কুবেরকে এখানে অনেকটা অনুভূতিহীন এবং রগচটা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কেতুপুর থেকে স্ত্রী-সন্তান ছেড়ে আসার পর কুবের কে খুব বেশী দুঃখিত মনে হয়নি। যদিও লেখক দেখিয়েছেন যে মাঝে মাঝে তাদের কথা মনে পরত।
ময়নাদ্বীপে আসার পর কুবের কপিলার কি হল তাই নিয়ে লিখেছেন। কিন্তু কেতুপুরে কুবেরের রেখে আসা স্ত্রী-সন্তানদের কি হল তার দিকে দৃষ্টিপাত করেননি। কুবেরের অবর্তমানে মালা কিভাবে সংসার সামলাচ্ছে বা রাসু কি গোপীকে বিয়ে করেছে তা আর জানা গেল না। পদ্মা নদীর মাঝি তে হোসেন মিয়া প্রায়ই কেতুপুরে যেত। ময়নাদ্বীপে তার খুব বেশি বর্ননা নেই। হোসেন মিয়া কি পরবর্তীতে কুবেরের স্ত্রী-সন্তানদের ময়নাদ্বীপে নিয়ে আসতে পারত? নাকি আর্থিক সাহায্যের মধ্যমে ময়নাদ্বীপে সংসার চালাতে সাহায্য করছিল। কুবেরের বিরুদ্ধে মামলারই বা কি হয়েছিল? সংক্ষিপ্ত ভাবে এইসব দিকে নজরপাত করার সুযোগ লেখক নেননি।
ময়নাদ্বীপ গল্পটি একটু দুর্বল হলেও পাঠকের ভালো লাগবে। বিশেষ করে কুবের-কপিলার নুতন জীবনের বিভিন্ন ঘটনা পাঠকের অতৃপ্তি কিছুটা হলেও ঘুচাবে। লেখকের প্রচেষ্টার জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই।
রেটিংঃ
বইটিকে আমি ১০ এ ৬ দিব। আমার রেটিং শুধু আমার নিজের ভালোলাগা থেকে। আমার এ রেটিং অন্যদের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে।
পুনশ্চঃ
ময়নাদ্বীপ পড়ার পর মনে হল ময়নাদ্বীপ নিয়ে আরো সুন্দর গল্প লেখা যেতে পারে। তাছাড়া কুবের বিহীন কেতুপুর নিয়েও গল্প লেখা যাতে পারে। আর সবচেয়ে আকর্ষনীয় হবে হোসেন মিয়াকে নিয়ে কোন উপন্যাস লেখা হয়। বিশেষ করে হোসেন মিয়া কিভাবে হোসেন মিয়া হয়ে উঠল তার জীবনবৃতান্ত অনেক পাঠকে আকৃষ্ট করবে বলে আমার বিশ্বাস। ইতিমধ্যে কেউ লিখে না ফেললে আশা করি ভবিষ্যতে কেউ এই অতৃপ্তিগুলো নিয়ে লিখবে।
বই সংগ্রহের জন্যঃ রকমারী.কম এ দেখুন।
Discover more from Redwan's Almost Daily Blog
Subscribe to get the latest posts sent to your email.